মুদ্রণ ছেড়ে ডিজিটালে নিউজউইকের যাত্রা

২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদ সাময়িকী ‘নিউজউইক’ ঘোষণা দেয়, প্রায় ৮০ বছরের মুদ্রণ-ইতিহাসের ইতি টেনে তারা ডিজিটাল-নির্ভর প্রকাশনায় যাবে। সেই বছরের ৩১ ডিসেম্বর সাময়িকীটির শেষ মুদ্রিত সংখ্যা ছাপা হয়। পরের বছর ২০১৩ সালে ‘নিউজউইক গ্লোবাল’ নামে ডিজিটাল-নির্ভর সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ছাপা সাময়িকীর একটি অধ্যায় শেষ হয় এবং অনলাইনভিত্তিক সাংবাদিকতার নতুন পথে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
মুদ্রণ ও বিতরণে বিপুল খরচ নিউজউইকের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে উঠেছিল। কাগজ, ছাপা, পরিবহন ও বিতরণের ব্যয় ক্রমে বাড়তে থাকায় পত্রিকাটির মালিকপক্ষের জন্য মুদ্রণ ও বিতরণের প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ছাপা সংস্করণ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার মুখে পড়ে এবং ডিজিটাল প্রকাশনার দিকেই প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকতে বাধ্য হয়।
একই সময়ে সাময়িকীটির ছাপা সংস্করণে বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ কমছিল। বিজ্ঞাপনের বড় অংশ অনলাইন মাধ্যমে চলে যাচ্ছিল, যার ফলে মুদ্রণনির্ভর সংবাদ সাময়িকীর আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। আয় কমে আসা এবং খরচ বেড়ে যাওয়ার এই দ্বিমুখী চাপে ছাপা সংস্করণের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ছিল ডিজিটালে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
নিউজউইকের গ্রাহকসংখ্যা একসময় প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০১২ সালের মধ্যে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। অন্যদিকে মানুষ দ্রুত খবর জানতে ওয়েবসাইট, স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের দিকে ঝুঁকছিল। পাঠকের এই পরিবর্তিত অভ্যাস এবং প্রযুক্তির বিস্তার মুদ্রণনির্ভর প্রকাশনার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়, আর প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন মাধ্যমের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করে।
নিউজউইক ২০১০ সালে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি বিস্ট’ এর সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। এর মাধ্যমে ডিজিটাল পাঠক ও অনলাইনে সংবাদ বিতরণের সম্ভাবনা সামনে আসে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ছিল ‘নিউজউইক গ্লোবাল’ নামে একটি ডিজিটাল সংস্করণ চালু করা, যা পরে ২০১৩ সালে বাস্তবায়িত হয়। এই একীভূতকরণ অনলাইন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সম্পৃক্ততা বাড়ায়।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান। সামগ্রিকভাবে নিউজউইকের এই যাত্রাবদল দেখায়, কীভাবে ক্রমবর্ধমান খরচ, বিজ্ঞাপন আয়ের পতন ও পাঠকের অভ্যাস পরিবর্তনের চাপে একটি ঐতিহ্যবাহী মুদ্রণ সাময়িকী ডিজিটাল-নির্ভর প্রকাশনায় সরে যেতে বাধ্য হয়। প্রায় আট দশকের মুদ্রণ ঐতিহ্য শেষ করে অনলাইনভিত্তিক সংস্করণে মনোযোগ দেওয়া ছিল প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকার কৌশল, যা সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তনশীল সময়ের চিত্রও তুলে ধরে।