সকালে দাঁত না মেজে খাবার খেলে কী হতে পারে, জেনে নিন বিস্তারিত

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকের মুখে দুর্গন্ধ, জিহ্বায় আস্তরণ এবং অপ্রীতিকর স্বাদ অনুভূত হয়। এর প্রধান কারণ, ঘুমের সময় লালা উৎপাদন কমে যায় এবং মুখের ব্যাকটেরিয়ার বর্জ্য পদার্থ জমা হতে পারে। অনেকেই আবার তাড়াহুড়ো করে দাঁত না মেজেই সকালের নাস্তা সেরে ফেলেন। যদিও মাঝে মধ্যে একদিন ব্রাশ না করলে বড় ক্ষতি হয় না, কিন্তু প্রতিদিন এই অভ্যাস গড়ে উঠলে ব্যাকটেরিয়ারা নাস্তার চিনি ও শ্বেতসার খেয়ে প্লাক তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে দাঁত ও মাড়ির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
সকালে মুখ পরিষ্কার করা কেন জরুরি, তা বুঝতে হলে ঘুমের সময় মুখের পরিবর্তন জানা দরকার। ঘুমের মধ্যে লালা উৎপাদন কমে যায়, অথচ লালা খাবারের কণা ধুয়ে ফেলে, অ্যাসিড প্রশমিত করে এবং দাঁতের এনামেল রক্ষা করে। লালার পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া ও অ্যাসিডের বিরুদ্ধে মুখের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে দাঁতের উপর ও মাড়ির কিনারায় প্লাক নামক আঠালো স্তর জমতে পারে, যা মুখে বাজে স্বাদ ও দুর্গন্ধের অন্যতম কারণ।
এই বিষয়ে একটি গবেষণা প্রমাণ দেয় যে রাতারাতি মুখের জীবাণু পরিবেশ বদলে যায়। ২০২১ সালে পিএলওএস ওয়ানে প্রকাশিত এক গবেষণায় ১০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ঘুমের আগে ও পরে মুখের বায়োফিল্মের পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা দেখেন, ঘুমের পরে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার গোষ্ঠীর আপেক্ষিক প্রাচুর্য পরিবর্তিত হয়। গবেষণাটি ছোট হলেও এটি ধারণাকে সমর্থন করে যে রাতভর মুখের জীবাণু পরিবেশ পরিবর্তিত হয়।
ব্রাশ না করে খেলে প্রথমত ব্যাকটেরিয়া শক্তি পায়। সকালের নাস্তায় মিষ্টি চা, বিস্কুট, রুটি বা পরোটার মতো খাবারে চিনি ও শ্বেতসার থাকে। এই কার্বোহাইড্রেট মুখের ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহজলভ্য খাদ্য হয়ে ওঠে এবং তারা অ্যাসিড তৈরি করে দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে। বিদ্যমান প্লাকের উপর খাবার খেলে ব্যাকটেরিয়ারা নতুন খাদ্য পায়, ফলে ক্রমাগত অ্যাসিড আক্রমণে এনামেল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দাঁতের ক্ষয় বাড়তে পারে। তবে একবার ব্রাশ ছাড়া নাস্তা করলেই গর্ত হবে না; খাদ্যাভ্যাস, ফ্লোরাইড, লালা ও মুখের স্বাস্থ্যবিধি দাঁতের ক্ষয় নির্ধারণ করে।
দ্বিতীয়ত, মাড়ি ফুলে যেতে পারে। দাঁত থেকে প্লাক সরানো না হলে তা মাড়িতে জ্বালা সৃষ্টি করে। চিকিৎসা না করালে লালচে ভাব, ফোলাভাব ও রক্তপাত হতে পারে। ধীরে ধীরে প্লাক শক্ত হয়ে টারটারে পরিণত হয়, যা ডেন্টিস্ট বা ডেন্টাল হাইজিনিস্টকে চেঁছে ফেলতে হয়। সমস্যাটি একবারের নয়, বরং পুনরাবৃত্তিমূলক অভ্যাস। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ প্লাকের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে আরও গুরুতর সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
তৃতীয়ত, সকালের নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ বেশিদিন থাকতে পারে। জিহ্বা ও দাঁতের চারপাশের ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি যৌগ নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধের কারণ। খাওয়ার মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়ার স্তর দূর হয় না; খাবার সরিয়ে না ফেলা পর্যন্ত গন্ধ ক্ষণস্থায়ী থাকে, কিন্তু মুখ পরিষ্কার না করলে গন্ধ ফিরে আসে। খাবারের সঙ্গে কিছু ব্যাকটেরিয়া গিলে ফেলা হয়, যা বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য মূল উদ্বেগের নয়, কারণ পাকস্থলীর অ্যাসিড অনেক জীবাণু ধ্বংস করে। মূল সমস্যা দাঁত ও মাড়িতে থেকে যাওয়া ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ।
সকালের নাস্তার আগে নাকি পরে ব্রাশ করবেন, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা নাস্তার আগে ব্রাশ করার পরামর্শ দেন, কারণ এটি ঘুমের সময় জমে থাকা প্লাক দূর করে এবং দাঁতে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট রেখে দেয়। ফ্লোরাইড এনামেলের কাঠিন্য ও ক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়। তাই নিয়মিত ও সঠিক সময়ে মুখ পরিষ্কার রাখাই দাঁত ও মাড়ির সুস্থতার প্রধান উপায়।