বাংলাদেশ • শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬সত্যের পথে, প্রতিদিন
এ আই নিউজ

দেশের খবর, বিশ্বের খবর
আপনার প্রতিদিনের সংবাদ

জাতীয়

দুই ছেলেকে নিয়ে পূজামণ্ডপে নয়নী, বনানীতে ‘জলজ’ থিমে ভিন্নতা

দুই ছেলেকে নিয়ে পূজামণ্ডপে নয়নী, বনানীতে ‘জলজ’ থিমে ভিন্নতা
এ আই নিউজ

গত বছর পূজার সময় ছোট ছেলে বিক্রম বিশ্বাসের বয়স ছিল মাত্র ২৯ দিন। এত ছোট শিশুকে নিয়ে পূজামণ্ডপে ঘুরতে বের হওয়া সম্ভব হয়নি নয়নী সোমের। এবার স্বামী বিনয় বিশ্বাস, তিন বছর বয়সী বড় ছেলে রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও এক বছর বয়সী বিক্রমকে নিয়ে বনানী পূজামণ্ডপে এসেছেন তিনি। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বনানী পূজামণ্ডপে কথা হয় নয়নীর সঙ্গে। দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। জানালেন, এবারের পূজা তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের।

কথা বলতে বলতে দুই সন্তানের দিকে তাকিয়ে নয়নী সোম বলেন, ‘এ বছর দুই ছেলেকে নিয়ে পূজায় আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে। গত বছর ছোটটা একদম ছোট ছিল, তাই বের হতে পারিনি। এবার পরিবারের সবাই মিলে ঘুরছি, তাদের সঙ্গে নতুন স্মৃতি তৈরি হচ্ছে, ছবি তুলছি—সব মিলিয়ে এবারের পূজার আনন্দ অন্য রকম।’ নয়নী সোমদের বাসা বাড্ডায়। স্বামী বিনয় বিশ্বাস একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

আজ বিকেলে রাজধানীর বনানী পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, দেবী দুর্গার প্রতিমা দর্শনে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিমার সামনে প্রণাম ও প্রার্থনা করছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে দেখছেন মণ্ডপের সাজসজ্জা। আবার অনেকে মণ্ডপের নান্দনিক সাজের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, সেলফি নিচ্ছেন। শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকদের উপস্থিতিতে মণ্ডপজুড়ে ছিল উৎসবের বাড়তি আনন্দ।

এমনই একটি পরিবারের দেখা মেলে মণ্ডপে। সাভার থেকে পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে বনানী পূজামণ্ডপে এসেছেন অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার বিকর্ণ কুমার চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী, মেয়ে, ছোট ভাই, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং ছোট ভাইয়ের দুই মেয়ে। সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রতিমা দর্শনের মধ্য দিয়ে তাঁদের পূজামণ্ডপ ঘোরার যাত্রা শুরু হয়। সেখান থেকে রামকৃষ্ণ মিশন হয়ে অন্যান্য মণ্ডপে যান বলে জানালেন।

পেশাগত জীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন বিকর্ণ কুমার চৌধুরী। আগে পূজার সময় দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকলেও অবসরে যাওয়ার পর এবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে পূজার আয়োজন উপভোগ করছেন তিনি। তাঁর চোখে এবারের আয়োজন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশ গোছানো। বিকর্ণ কুমার চৌধুরী বলেন, ‘পরিবেশ অনেক সুন্দর, প্রস্তুতিও মনোমুগ্ধকর। এক কথায়, সবকিছুই মনোমুগ্ধকর।’ পূজা পরিদর্শনে আসা ওই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য রাইকা কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। সে জানায়, বড়দের সঙ্গে পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখতে তারও খুব ভালো লাগছে।

বনানী পূজামণ্ডপে এবার দেবী দর্শনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সামনে উঠে এসেছে নদী, পানি ও জলকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতির গল্প। মণ্ডপের প্রবেশপথ থেকে ভেতরের সাজসজ্জা—সবখানেই রয়েছে ‘জলজ’ ভাবনার ছাপ। আয়োজকদের উদ্দেশ্য শুধু নান্দনিক একটি পূজামণ্ডপ তৈরি করা নয়, বরং পানির গুরুত্ব, নদীর সংকট এবং জলকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর হারিয়ে যেতে থাকা জীবনধারা নিয়ে মানুষকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা। ২০০৮ সালে এই মণ্ডপে পূজা শুরু হয়। এ বছর ১৯তম বছরে পদার্পণ করেছে বলে জানিয়েছেন গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায়। এবারের থিম ‘জলজ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অথচ ধীরে ধীরে নদ-নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। নদী ও পানিকে ঘিরে যেসব জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেগুলোও নানা কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই বাস্তবতা সামনে আনতেই জলকে এবারের পূজার মূল ভাবনা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।’ মণ্ডপের প্রবেশপথটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন দর্শনার্থীরা একটি জলাধারের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করছেন। ভেতরে মাছ ধরার সরঞ্জাম, শেওলা এবং জলকেন্দ্রিক নানা উপকরণের মাধ্যমে নদী ও পানির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিমার পেছনে রয়েছে শঙ্খ, আর তার সামনে অধিষ্ঠিত দেবী দুর্গা। সাজসজ্জার প্রতিটি অংশে তাই রয়েছে প্রকৃতি, পানি ও মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গল্প। এই থিমের সঙ্গে সরাসরি ধর্মীয় কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান বিনয় গোপাল রায়। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়েই পানির সংকট ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সেই সংকট সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং জলাধার রক্ষায় নাগরিকদের দায়িত্বশীল করে তোলাই এবারের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা বার্তা দিতে চাই, ঢাকা শহরে যাঁরা থাকি কিংবা দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা বসবাস করি, আমরা যেন জলাধারগুলো নষ্ট না করি। আমরা সবাই যেন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করি।’ মণ্ডপের সাজসজ্জায় পরিবেশবান্ধব ভাবনারও প্রতিফলন রয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা। তাঁদের ভাষ্য, পুরো কাঠামো টেকসই উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। খাবার পরিবেশনের জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য পাত্র। দুর্গাপূজা ঘিরে বনানীসহ গুলশান বিভাগের প্রধান পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. মামুনুর হক জানান, নিয়মিত মোতায়েনের বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীদের কোনো সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। মোবাইল ফোন হারানোসহ বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী সেখান থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মণ্ডপের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ছাদে পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। পূজার দশমী পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল থাকবে। দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সদস্যদের নিয়মিত পালা করে পরিবর্তন করা হবে। পাশাপাশি পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সভার মাধ্যমে তাঁদের পর্যবেক্ষণ এবং পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি বলে জানান এডিসি মামুনুর হক। পুলিশ, পূজা উদ্‌যাপন কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত সহযোগিতায় উৎসব সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা তাঁর।

প্রচ্ছদে ফিরুন ←