বাংলাদেশ • শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬সত্যের পথে, প্রতিদিন
এ আই নিউজ

দেশের খবর, বিশ্বের খবর
আপনার প্রতিদিনের সংবাদ

বিশ্ব

হেফাজতের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য প্রক্রিয়ায় মতবিরোধ, জামায়াত বাদ পড়ায় সন্দেহ

হেফাজতের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য প্রক্রিয়ায় মতবিরোধ, জামায়াত বাদ পড়ায় সন্দেহ
এ আই নিউজ

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গঠিত হয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিল জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের আগমুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও বাকি দলগুলো এখনো ঐক্যবদ্ধ। অন্যদিকে, জামায়াতকে দূরে রেখে কওমী ধারার ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে নতুন একটি জোট গঠনের চেষ্টা চলছে। এই নতুন সম্ভাব্য জোটে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্তত দুটি দল থাকলেও জামায়াতে ইসলামীকে রাখা হয়নি। ফলে এই ইসলামী ঐক্যের উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনীতিতে নানা আলোচনা চলছে।

হেফাজতে ইসলামের এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় মূলত সাতটি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলকে ডাকা হয়েছে। দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। হেফাজতে ইসলাম নিজে রাজনৈতিক দল না হলেও এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরউল্লাহ বলেন, তারা চান সাতটি দল একসঙ্গে থাকুক, বিভক্তি দূরে ঠেলে একসঙ্গে পরামর্শ করে চলুক।

তবে কয়েক মাস ধরে কয়েক দফা বৈঠক হলেও ঐক্য চূড়ান্ত হয়নি, এমনকি কোনো রূপরেখা বা উদ্দেশ্যও নির্দিষ্ট হয়নি। দলগুলোর কর্মসূচি ও চাওয়া-পাওয়ায় ভিন্নতা থাকায় ঐক্যের আগেই নানা প্রশ্ন ও মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল মূলত কওমি ও দেওবন্দ ঘরানার; এর বাইরে কোনো দলকে রাখা হয়নি। বিশেষ করে ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামী এই উদ্যোগে নেই। আবার কওমি ঘরানার কয়েকটি ছোট দলকেও বাদ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালউদ্দীন আহমদ বলেন, দলবৃদ্ধির বিষয়টি ফোরামে তোলা হয়েছে এবং আরো ছোট দলকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না তা আলোচনা হয়েছে; তবে সিদ্ধান্ত সাত দলের সম্মতিতেই হবে। অন্যদিকে হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীর উল্লাহ জানান, জামায়াতকে না রাখার পেছনে আক্বিদাগত ব্যাপার আছে। তিনি বলেন, জামায়াত তাদের শত্রু না, কিন্তু তাদের আক্বিদা ভিন্ন; আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতাদর্শ থেকে তারা বাইরে, তাই জামায়াতকে নেওয়া হচ্ছে না। এটি রাজনৈতিক দূরত্ব নয়, ধর্মীয় ইস্যু।

সাত দলের ঐক্য নিয়ে সর্বশেষ বৈঠক হয় গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। সাত দলের প্রতিটি থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। তবে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি; বিশেষ করে এই ঐক্যে থাকা দলগুলো অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে মূল মতপার্থক্য দেখা যায়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে, এই জোটে যারা থাকবে তারা অন্য কোনো জোটে থাকলে ইসলামী ঐক্য কার্যকর হবে না। দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, সাত দল এক হওয়ার পরও যদি কেউ জামায়াতের দিকে, কেউ বিএনপির দিকে থাকে, তাহলে ঐক্য ফলপ্রসূ হবে না, লক্ষ্য অর্জিত হবে না, শক্তি হিসেবেও দাঁড়াতে পারবে না। তারা স্পষ্ট বলেছে, এই ঐক্যে যারা থাকবে তাদের অন্য কোনো বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকতে পারবে না।

কিন্তু এই শর্তে আপত্তি আছে কয়েকটি দলের, তার একটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ বলেন, জোটে গেলেও দলীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় এমন শর্ত মানবেন না। তিনি বলেন, শুধু তারা নন, আরো কিছু দল আছে যারা প্রস্তাব করছে যে ঐক্য হবে, তবে রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা থাকতে হবে। ইসলাম বা দেশবিরোধী কাজ হলে একসঙ্গে প্রতিবাদ-আন্দোলন হবে, কিন্তু রাজনৈতিক জোট বা নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা প্রত্যেক দলের আলাদা এখতিয়ার থাকা উচিত।

এটা স্পষ্ট যে, ঐক্য গড়ার আগেই মূলত রাজনৈতিক কারণে দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে, যেখানে না থেকেও জামায়াত একটি বড় ইস্যু। দলগুলো প্রকাশ্যে ঐক্য চাইলেও নতুন জোটের রাজনীতি নিয়ে নানা মত আছে। বিভিন্ন দলের ভেতরে কারো কারো মধ্যে এই ঐক্য প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কী আছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কেউ কেউ মনে করেন, নেপথ্যে সরকার ভূমিকা রাখছে এবং সরকার জামায়াতে ইসলামীর বাইরে ইসলামপন্থি দলগুলোর আলাদা জোট চায়।

বিশেষ করে অন্য কোনো জোটে থাকলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার শর্ত জামায়াতকে লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতটি দলের একটি দলের শীর্ষ নেতা। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের অবশ্য নতুন ঐক্যের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ইসলামী দলগুলোর ব্যাপারে তাদের কোনো কথা নেই; তাদের আক্বিদা খুবই ক্লিয়ার, তারা জনগণের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছে। ইসলামী দলগুলোর প্ল্যাটফর্ম হলে তারা সেটাকে ওয়েলকাম জানাবেন।

জামায়াত স্বাগত জানালেও ভেতরে ভেতরে হেফাজতের ইসলামি ঐক্য শেষপর্যন্ত জামায়াতবিরোধী জোটে রূপ নেয় কি না, তা নিয়ে দলটির ভেতরে উদ্বেগ আছে। বিশেষ করে একদিকে ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে একইসময়ে হেফাজত ও হেফাজত-প্রভাবিত আলেমদের কেউ কেউ জামায়াতের আক্বিদা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সন্দেহ বেড়েছে। দলটির নেতারা প্রকাশ্যে বক্তব্য না দিলেও অনেক কর্মী-সমর্থক মনে করেন, এসবের মাধ্যমে জামায়াতকে টার্গেট করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কওমি ঘরানার সমর্থকদের সঙ্গে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি স্ট্যাটাস ও মন্তব্যও সামনে এসেছে।

এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে হেফাজতসহ ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সঙ্গে সরকারের কারো কারো যোগাযোগ। সম্প্রতি হেফাজতের আমিরসহ একাধিক বৈঠকে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনকেও। যদিও তিনি বলছেন, এসব সাক্ষাত জোটের বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তিনি বলেন, যারা ইসলামের প্রচারে-প্রসারে কাজ করছে তাদের সঙ্গে বিএনপির আত্মিক বন্ধন রয়েছে; সেই বন্ধনে যাতে ভাটা না পড়ে সেজন্যই নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। হেফাজতের নেতৃত্বে যে সাত দলীয় জোট, সেটার সঙ্গে তাদের সাক্ষাতের কোনো সম্পর্ক নেই; পেছন থেকে বিএনপি কোনো কলকাঠি নাড়াচ্ছে না।

প্রচ্ছদে ফিরুন ←