ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের 'টোপ' হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ, তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশি তরুণদের 'টোপ' হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দেশে ফেরা রাজন হোসেন নামের এক তরুণ জানান, নির্মাণকাজের প্রলোভনে তাকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। কিন্তু পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ করানো হয়। তিন সপ্তাহ প্রশিক্ষণের পর তাকে সরাসরি ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হয়। তার সঙ্গে আরও ২৯ বাংলাদেশি ছিলেন। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন, পরে আরও তিনজন মারা যান। মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়।
রাজন হোসেন জানান, যুদ্ধে পাঠানোর দুই দিনের মাথায় ড্রোন হামলায় তার কোমর ও পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুই পা অবশ হয়ে পড়ে। ওয়াকিটকিতে সাহায্য চাইলেও কেউ উদ্ধারে আসেনি। চারদিন না খেয়ে, হাত ও বুকে ভর দিয়ে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রুশ ক্যাম্পে পৌঁছান। সেখানে চিকিৎসার বদলে অস্ত্র কোথায় জানতে চেয়ে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে ক্যাম্পের অস্থায়ী হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে তিনি জানতে পারেন, তার দলের আরেক বাংলাদেশি শিগগিরই মারা যাবে। এই কথা শুনে তিনি বুঝতে পারেন, তাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে 'টোপ' হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রুশ সেনারা তাদের ওপর ড্রোন হামলা থেকে শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে পরে সেখানে হামলা চালাত। রাজন হোসেনকে পরে রাশিয়ায় নেওয়া হয় এবং মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় আগস্টের শেষে দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরে তিনি জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল নামের ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশের বিশেষ ইউনিট এসআরবি তদন্তে নামে। তদন্তে আরও দুটি এজেন্সি—আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপের সন্ধান মেলে। এসআরবি-১০ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, এই তিন এজেন্সি চাকরির প্রলোভনে ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, চক্রটির সঙ্গে রাশিয়ার নাগরিক ইগর ও কিরগিজস্তানের নাগরিক জুলিয়া জড়িত। বাংলাদেশি সমন্বয়কারী জাবালে নূরের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসআরবি বলছে, ৩০ জনকে তিন ভাগে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনেই ১৭ জন নিহত হন, পরে আরও তিনজন মারা যান। মোট ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
নিহতরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। বিদেশে যাওয়ার টাকা জোগাড় করতে তারা জমি-জমি, গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন, কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন। লালমনিরহাটের আব্দুল্লাহ আল মামুনের বাবা আব্দুল মাজিদ জানান, ছেলেকে ফিরে পাবেন না, শুধু মরদেহ ফেরত চান। আল আমিন ইসলাম এখনও বেঁচে আছেন, তিনি দেশে ফেরার জন্য কান্নাকাটি করছেন। পরিবারগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ছুটাছুটি করলেও এখনও পর্যন্ত নিহত ছয়জনের মরদেহও ফেরত আসেনি।