বাংলাদেশ • শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬সত্যের পথে, প্রতিদিন
এ আই নিউজ

দেশের খবর, বিশ্বের খবর
আপনার প্রতিদিনের সংবাদ

বিশ্ব

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি
এ আই নিউজ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মন্দিরের কাছে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ১২ই অক্টোবর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। আয়োজনস্থলের পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির থাকায় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। হিন্দু শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই শিক্ষার্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করেছে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। তবে আয়োজক শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া ছিল না এবং আপত্তির পর তারা মন্দির থেকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে রান্না করেছেন।

কেন্দ্রীয় মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জয় সাহা স্বীকার করেছেন যে মন্দির থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে রান্না করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ১২ই অক্টোবর রাত ৮টার দিকে মন্দিরের সামনে কয়েকজনকে খিচুড়ি রান্না করতে দেখে তিনি ও আরও কয়েকজন গিয়ে জানতে চান, “এটা কিসের খিচুড়ি?” শুরুতে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। তিনি বলেন, “মাংস দেখে মনে হলো এটা মুরগি না; হয় খাসি বা গরু। পরে একজন বললো, গরু। যেহেতু মন্দিরের সামনে, আমাদের একটু হলেও খারাপ লাগছে। আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগছে। আমরা তাদের সরায়ে নিতে বলি।” তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ বলেছিল মন্দিরের সীমানা নির্ধারণ করে দিতে, যা উত্তেজিত করার মতো ছিল। প্রক্টর আসার পর তারা প্রায় দশ হাত দূরে যায়।

সেদিন প্রায় দেড় ঘণ্টা কথা কাটাকাটির পর সনাতন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে একটি মিছিল করেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রাকিব মাদবর বলেন, উভয় ধর্মের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গ্রুপে তর্ক-বিতর্ক করে এবং এক পর্যায়ে এটি গণমাধ্যমের নজরে আসে; শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ও বিজ্ঞপ্তি দেয়। তিনি বলেন, মুসলিম কমিউনিটির একটু উগ্রপন্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বলে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাধা দেওয়ায় এবং বাংলাদেশে ৯২ শতাংশ মুসলিম হওয়ায় প্রতিবাদে আবারও আয়োজন করা হবে। শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপ এটা প্রচার করে।

তবে কেউ কেউ বলছেন, ঘটনার সূত্রপাত মন্দিরের ইট ব্যবহারকে কেন্দ্র করে। মন্দিরের সামনে পড়ে থাকা অব্যবহৃত ইট নিয়ে ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা চুলা বানিয়ে রান্নার আয়োজন শুরু করলে হিন্দু শিক্ষার্থীরা বাধা দেয় যে ইটগুলো মন্দিরের। যদিও জয় সাহা বলছেন, “মেইন আপত্তি ছিল মন্দির এত সামনে। ওরা ন্যারেটিভ নিয়ে গেছে ইটের দিকে।” ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, তারা ইটগুলো আর ব্যবহার করেনি, ফিরিয়ে দিয়েছে এবং পরে ক্যাফেটেরিয়া থেকে চুলা এনে রান্না করেছে।

ক্যাম্পাসে গরু জবাই হতে পারে আভাস পেয়ে প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি জারি করে। গতকাল ১৪ই অক্টোবর প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. আজম খানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই গণবিজ্ঞপ্তিতে ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১’ অনুযায়ী নির্ধারিত জবাইখানা ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাই এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার সিল ছাড়া মাংস বিক্রি অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড হতে পারে।

প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার ক্যাম্পাসে গরু ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পোস্টে অংশগ্রহণের জন্য ৭০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করা হয়। অধ্যাপক আজম খান বলেন, “যে ঘটনা ঘটছে তা খুব-ই তুচ্ছ ছিল। গতকাল আমরা বুঝতে পারলাম যে পশু কোরবানি হবে। তাই একটি নোটিশ জারি করি। কারণ পূজা-টূজা চলছে, এরকম করে যেন পশু জবাই না করা হয়। তাই নিষেধ করেছিলাম। এতে ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা বলছে যে শুক্রবার তারা গরু জবাই করবে।” পরে প্রশাসন আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ১২ই অক্টোবরের ভুল বোঝাবুঝি প্রক্টরের উদ্যোগে ঘটনাস্থলেই সমাধান করা হয় এবং পরদিন আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। নতুন পরিস্থিতি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি অবনতি এড়াতে প্রক্টর পশু জবাই থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রশাসন জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠানের অধিকার সবার রয়েছে, তবে একটি আয়োজন যেন অন্য আয়োজনের পথে বাধা না হয়।

শুক্রবারের গরুভোজ আয়োজকরা জানিয়েছেন, গরু জবাই ওইদিনই হবে। চাঁদার টাকায় একটি গরু কেনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ছাত্র মজলিশ নামের একটি সংগঠন একটি গরু দেবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়োজক কমিটির একজন বলেন, “গরু নিয়া যেহেতু এত ক্ষোভ, তাই আমরা ভাবছিলাম দুর্গাপূজার পর গরু নিয়া আয়োজন করবো। কিন্তু গতকাল যখন প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দিল যে ক্যাম্পাসে গরু জবাই দেওয়া যাবে না, তখন এটা শিক্ষার্থীদের আহত করে। প্রশাসন এই কাজটা যেহেতু করলো, তাই শিক্ষার্থীরা ফান্ড তুললো। আগামীকাল পার্টিটা হবে।” তিনি জানান, তারা মন্দিরের সামনে না, হয়তো কলাভবনের কাছের মাঠে গরু জবাই করবেন। জকসু সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, “প্রশাসনের সাথে আজ জকসুর বৈঠক হয়েছে। উভয় পক্ষ থেকেই সম্মতি এসেছে যে আয়োজনটা করতে পারে। এটা প্রশাসনের প্রতিবাদস্বরূপ একটা আয়োজন।” প্রক্টর আজম খান বলেন, কোরবানির সময় ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত স্থানে পশু কোরবানি করা হয়। কিন্তু প্রতিবাদস্বরূপ শুক্রবার গরু জবাই করলেও “মার্জিতভাবে করতে হবে” যাতে ধর্মীয় দিক থেকে নতুন কোনো ঘটনা না ঘটে। জয় সাহা বলেন, “ওরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করতে চাইছে, করুক, সমস্যা নাই। কিন্তু সেটা যেন মন্দিরের সামনে না হয়, মন্দিরের শৃঙ্খলা নষ্ট না হয়। ওরা ১০টা গরু জবাই করুক, মন্দিরের সামনে না করুক।”

প্রচ্ছদে ফিরুন ←