সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থার নিন্দা

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থা। তারা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে প্রশাসনের গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে ও রাতে দেবহাটায় দুই দফায় মারধরের শিকার হন ওয়াহিদুজ্জামান। প্রথম দফায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু রাতে হাসপাতাল থেকে হামলাকারীরা তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় মারধর করলে তাঁর মৃত্যু হয়।
আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে গণপিটুনি এবং পুলিশ উদ্ধার করার পর হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনা আইনের শাসন ও নাগরিকের জানমালের ওপর মারাত্মক আঘাত। হাসপাতাল যদি একজন আহত মানুষের জন্যও নিরাপদ না হয়, তবে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়—এই জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। এনসিপি আরও বলেছে, অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করার অধিকার কারও নেই। নিহত ব্যক্তি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে, সেটিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অডিওর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি এবং নিহত ব্যক্তির পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে দলটি।
সাতক্ষীরার এই ঘটনাকে ‘চরম বর্বরতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে গণসংহতি আন্দোলন। দলটির প্রধান সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) দেওয়ান আবদুর রশিদ ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান আজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, উসকানি দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা এবং চিকিৎসাধীন একজন মানুষকে হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে রক্ষা করতে না পারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। তাঁরা অবিলম্বে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা ও হাসপাতালের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে মানবিক মর্যাদা ও জীবনের অধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞা বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাঁর বিচার করার দায়িত্ব আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অধিকার কোনো গোষ্ঠীর নেই। শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানায় সংস্থাটি। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তির পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস।
এদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ এখনো পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে মনে হচ্ছে, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহত শামীমের পরিবার অভিযোগ করেছে, তাকে ষড়যন্ত্রের শিকার করা হয়েছে এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই হামলায় জড়িত।
এই ঘটনার পর সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এমন ঘটনা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও দ্রুত বিচার ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।