বাংলাদেশ • শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬সত্যের পথে, প্রতিদিন
এ আই নিউজ

দেশের খবর, বিশ্বের খবর
আপনার প্রতিদিনের সংবাদ

বিশ্ব

যৌতুকে পাওয়া বোম্বে: দশ পাউন্ড ভাড়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে

যৌতুকে পাওয়া বোম্বে: দশ পাউন্ড ভাড়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে
এ আই নিউজ

১৭শ শতকে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সঙ্গে পর্তুগালের রাজা চতুর্থ জনের কন্যা ক্যাথরিন অব ব্রাগানজার বিয়ে হয়। এই রাজকীয় বিয়ের যৌতুকে পর্তুগাল ইংল্যান্ডকে উত্তর আফ্রিকার তাঞ্জিয়ার, ব্রাজিল ও পর্তুগিজ ইস্ট ইন্ডিজে বাণিজ্যিক সুবিধা, পর্তুগালে বসবাসরত ইংরেজদের জন্য ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক স্বাধীনতা এবং ২০ লাখ পর্তুগিজ ক্রাউন (প্রায় তিন লাখ পাউন্ড) দেয়। এর বিনিময়ে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইংরেজ সামরিক ও নৌ সহায়তা পায় পর্তুগাল।

যৌতুকের অংশ হিসেবে পর্তুগাল ইংল্যান্ডকে আরব সাগরের তীরে সাতটি ছোট দ্বীপ দিয়ে গঠিত বোম্বে হস্তান্তরে সম্মত হয়। ১৫৩৪ সালে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ একটি চুক্তির মাধ্যমে এই দ্বীপগুলো পর্তুগালের কাছে হস্তান্তর করেন। কোলাবা, ওল্ড ওম্যানস আইল্যান্ড (লিটল কোলাবা), বোম্বে, মাজগাঁও, পারেল, ওরলি ও মাহিম নামের এই দ্বীপগুলো পর্তুগিজ ভারতের অংশ হয়ে যায়। পর্তুগিজ আমলে বোম্বেতে দুর্গ, গির্জা ও বাণিজ্যিক বসতি গড়ে উঠলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব ছিল একটি প্রাকৃতিক গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে।

বিয়ের চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, বোম্বের শান্তিপূর্ণ দখল দ্রুত ও কার্যকরভাবে গ্রেট ব্রিটেনের রাজা বা তার নিযুক্ত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু বোম্বে হস্তান্তরের বিষয়টি ভারতে পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে ভাইসরয় আন্তোনিও দে মেলো কাস্ত্রোর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। কাস্ত্রোর যুক্তি ছিল, বোম্বের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং এটি হস্তান্তর করলে পর্তুগালের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ১৬৬২ সালে দখল নিতে আসা ইংরেজ নৌবহরকে বোম্বে উপকূলে নামার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এই বিরোধের কারণে বোম্বের আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর সম্পন্ন হতে প্রায় চার বছর সময় লাগে এবং শেষ পর্যন্ত ১৬৬৫ সালে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। তবে মাত্র দুই মাস পর পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে একটি রাজকীয় আদেশ আসে, যাতে হস্তান্তর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা এরই মধ্যে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছিল। তারা মাজগাঁও, পারেল এবং পরে মাহিম দখল করে এই দাবি করে যে এসব এলাকা বোম্বের সংলগ্ন। পরে তারা অন্যান্য সংলগ্ন দ্বীপও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

ব্রিটিশ রাজশক্তি দ্রুতই বুঝতে পারে যে তারা একটি দূরবর্তী, অনিষ্টকর ও লোকসানজনক সম্পত্তি পেয়েছে, যা পরিচালনায় ব্যয় হয়, কিন্তু উল্লেখযোগ্য আয় দেয় না। অন্যদিকে তাঞ্জিয়ার স্থানীয় মরোক্কান বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে ছিল, যতক্ষণ না ১৬৮৪ সালে ব্রিটিশরা সেখান থেকে সরে যায়। তাই ১৬৬৮ সালে তারা বোম্বে ও সংলগ্ন দ্বীপগুলো ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দেয়, যারা তখন সুরাট থেকে ভারতে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

এর বিনিময়ে কোম্পানিকে বছরে মাত্র ১০ পাউন্ড ভাড়া দিতে হতো। পাশাপাশি কোম্পানি রাজাকে ছয় শতাংশ বার্ষিক সুদে ৫০ হাজার পাউন্ড ঋণ দেয়। ফলে কোম্পানি এমন একটি সুবিধা পায় যা নিকটবর্তী সুরাট কখনও দিতে পারেনি– নিজেদের পতাকার অধীনে নিজেদের নিরাপদ বন্দর। শুরুতে কোম্পানির জন্য অসাধারণ কোনো সম্পদ ছিল না বোম্বে, কারণ মুঘল, মারাঠা, পর্তুগিজ এবং ডাচরা সবাই ওই অঞ্চলে শক্তিশালী ছিল। তবে ১৮শ শতকের শেষভাগ এবং ১৯শ শতকের শুরুতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন, মারাঠা সংঘাত এবং গুজরাটের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ী ও কারিগরেরা বোম্বের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন এবং ১৮৪৫ সালের মধ্যে সাতটি দ্বীপই একীভূত হয়, যা এর উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।

প্রচ্ছদে ফিরুন ←